গ্রীষ্মের দাবদাহ যখন চারদিক পুড়িয়ে দেয়, তখন শুধু শরীর নয়, মনের উপরেও পড়ে তীব্র চাপ। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোতে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত তাপমাত্রা কখনো কখনো ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে যায়। এই প্রচণ্ড গরমে শরীরকে সুস্থ রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও নানা পেটের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই আসুন জেনে নেওয়া যাক, তীব্র গরমে কীভাবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা যায় এবং সুস্থ ও সতেজ থাকা যায়।
গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। এই পানির ঘাটতি পূরণ করা না হলে দেখা দেয় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। প্রতিদিন কমপক্ষে আট থেকে দশ গ্লাস, অর্থাৎ দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করা উচিত। তবে শুধু সাদা পানিই যথেষ্ট নয়, ডাবের পানি, লেবু-পানি, ঘরে তৈরি শরবত, তরমুজের রস এবং বেলের শরবত শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা বরফ মেশানো পানীয় খুব বেশি পান করা উচিত নয়। এতে হজমশক্তি দুর্বল হয় এবং গলায় সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। ক্যাফেইনযুক্ত চা-কফি এবং কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো শরীর থেকে আরও বেশি পানি বের করে দেয়।
গ্রীষ্মকাল মানেই রসালো ফলের মৌসুম। তরমুজ, আম, লিচু, আনারস, জামরুল এই ফলগুলো শুধু মুখরোচকই নয়, পুষ্টিগুণেও অতুলনীয়। তরমুজে প্রায় ৯২ শতাংশ পানি থাকে, যা শরীরকে দ্রুত আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। আমে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
সবজির মধ্যে শসা, লাউ, পটোল, কচু শাক ও পুঁই শাক বিশেষভাবে উপকারী। শসায় প্রচুর পানি ও সিলিকা থাকে যা ত্বকও ভালো রাখে। লাউ সহজে হজম হয় এবং পেট ঠান্ডা রাখে। প্রতিদিনের রান্নায় মৌসুমি সবজির সঠিক ব্যবহার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
গরমে কিছু খাবার শরীরের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
ভাজাপোড়া ও তেলযুক্ত খাবার: তেলে ভাজা খাবার হজম হতে বেশি সময় লাগে এবং শরীরে তাপ উৎপন্ন করে।
অতিরিক্ত মশলাদার খাবার: ঝাল-মশলা বেশি থাকলে ঘাম বাড়ে এবং পাকস্থলীতে সংক্রমণ হতে পারে।
বাসি ও প্যাকেটজাত খাবার: গরমে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়ে, তাই খাবার দীর্ঘ সময় বাইরে রেখে খাওয়া উচিত নয়।
অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন: এগুলো শরীর থেকে পানি টেনে নেয় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায়।
গরমে একবারে বেশি খাওয়ার চেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া ভালো। ভারী খাবার হজম করতে শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যা শরীরের তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। দই, ছাতু, মুড়ি, চিঁড়া ও হালকা ডাল-ভাত গরমের জন্য আদর্শ খাবার। দই শরীরকে ভেতর থেকে শীতল রাখে এবং প্রোবায়োটিক গুণে পেটের সুস্থতাও নিশ্চিত করে।
সকালের নাস্তায় ফলমূল ও দুধ, দুপুরে হালকা ভাত-তরকারি-ডাল এবং রাতে হালকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ ঘুমের সময় হজমশক্তি কম কাজ করে।
ঘামের সাথে শুধু পানিই নয়, শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ লবণ বের হয়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে মাংসপেশিতে টান ধরা, মাথাব্যথা এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। ঘরে তৈরি ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, কলা এবং সামান্য লবণ দেওয়া লেবুর শরবত এই ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে।
বাইরে কাজ করলে বা অতিরিক্ত ঘাম হলে সাথে স্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট পানীয় রাখুন। তবে বাজারের কোমল পানীয়কে ইলেকট্রোলাইটের বিকল্প মনে করবেন না, এতে চিনি ও কৃত্রিম উপাদান বেশি থাকে।
সুস্বাস্থ্য শুধু খাবারের উপর নির্ভর করে না। এই গরমে সুস্থ থাকতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে:
তীব্র গরমে সুস্থ থাকা সম্ভব, শুধু দরকার সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং পরিকল্পিত জীবনযাপন। মনে রাখবেন, শরীর আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটু সচেতনতা, একটু শরীরের প্রতি যত্ন যথেষ্ট সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকতে সহায়তা করবে। গরমকে ভয় নয়, বরং সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যান এবং প্রতিটি গ্রীষ্মের দিনকে সতেজভাবে উদযাপন করুন।